ধর্ম ডেস্ক:মক্কা বিজয় একটি অসাধারণ ঘটনা। নীরব রক্তপাতহীন এক জয়ের নাম মক্কা বিজয়। এটি এমন ঘটনা, যার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তাঁর দীন ও রাসুলকে শক্তিশালী করেছেন। তাঁর ঘর ও শহরকে কাফের-মুশরিকদের হাত থেকে মুক্ত করেছেন। এই বিজয়ে আসমানের অধিবাসীগণ খুশী হয়েছিল এবং দলে দলে লোক ইসলামে প্রবেশ করল।নবী (স.) ১০ হাজার মুজাহিদের একটি বাহিনী নিয়ে মক্কার উদ্দেশ্যে বের হন। মুজাহিদ বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে বিনা বাধায় মক্কায় জয় করলেন। অষ্টম হিজরির রমজান মাসে ৬৩০ খ্রিস্টাব্দের ১১ বা ১৩ জানুয়ারি মক্কা বিজয় হয়। এই বিজয় সূচিত হয়েছিল কোনো রক্তপাত ছাড়াই। প্রথমে তিনি কাবা ঘরের দিকে গেলেন। তাঁর চারপাশে আনসার ও মুহাজিরগণ ঘিরে ছিল। কাবায় গিয়ে তিনি আল্লাহর ঘরের তাওয়াফ করলেন। নবীজির (স.) হাতে একটি ধনুক ছিল। সেসময় কাবার ভেতরে৩৬০টি মূর্তি ছিল। ধনুকের মাধ্যমে এক এক করে তিনি মূর্তিগুলোকে ভেঙে ফেললেন। এ সময় তিনি কোরআনের এই আয়াতটি পাঠ করছিলেন- ‘বলুন, সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে। নিশ্চয়ই মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল।’ (সুরা বনি ইসরাঈল: ৮)অতঃপর মহানবী (স.) কাবার ভেতরে প্রবেশ করলেন এবং নামাজ পড়লেন। সেদিন মক্কার অধিবাসীরা ভয়ে একেবারে মুহ্যমান হয়ে পড়েছিল। ইসলামের মূলোৎপাটনে যারা নেতৃত্বভার গ্রহণ করেছিল, অশ্লীল ভাষায় মহানবী (স.)-কে অজস্র গালাগাল করত, বিষাক্ত বর্শা হাতে তাঁকে হত্যা করতে ওঁত পেতে থাকত, তাঁর দেহ মোবারক থেকে রক্ত ঝরাত, নামাজে নাড়িভুঁড়ি চাপা দিত, মাতৃভূমি ত্যাগ করতে যারা বাধ্য করেছিল, আজ তারা সবাই কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় দলে দলে কাবা প্রাঙ্গণে সমবেত হলো। আজ তাদের সেই দর্প, গর্ব ও আস্ফালন নেই। ১০ হাজার মুসলিম বাহিনী দ্বারা বেষ্টিত আজ তারা শিয়ালের মতো লেজ গুটিয়ে দুরুদুরু বুকে চেয়ে আছে দয়ার সাগর মহানবী (স.)-এর ফয়সালার দিকে।নামাজশেষে কাবার ভেতর থেকে বাইরে আসলেন নবীজি। কুরাইশরা তখন সারিবদ্ধভাবে বাইরে দাঁড়িয়ে অবস্থান করছিল। তিনি তাদেরকে সম্বোধন করে বললেন- হে কুরাইশ সম্প্রদায়! তোমাদের সঙ্গে আজ আমি কেমন আচরণ করব বলে মনে করো? সকলেই উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করতে লাগল- আমরা আপনার কাছ থেকে খুব ভাল আচরণ কামনা করছি। তিনি বললেন, ‘তোমাদের প্রতি আজ কোনো অভিযোগ নেই। যাও! তোমরা সবাই মুক্ত।’ শুধু তা-ই নয়, কাফের নেতা আবু সুফিয়ানের ঘরে যে ব্যক্তি আশ্রয় নেবে, তাকেও তিনি ক্ষমা করেন। তিনি ঘোষণা করেন, ‘যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের বাড়িতে আশ্রয় নেবে, সে নিরাপদ থাকবে।’ (আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৪০৫, ৪০১)নবীজির (স.) এই অপূর্ব করুণা দেখে ভীতসন্ত্রস্ত মক্কাবাসী অভিভূত হয়ে পড়ে। সজল নয়নে নির্বাক তাকিয়ে থাকে মহামানবের মুখের দিকে। এমনও কি হতে পারে? জীবনভর যাঁর সঙ্গে শত্রুতা করেছি, চিরতরে শেষ করার জন্য সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছি, তিনিই আজ এই বদান্যতা, করুণা ও কোমলতা দেখালেন? তারা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে নবীজি (স.)-এর চরণতলে নিজেদের সঁপে দেয়। তারা উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করতে থাকে—‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।’ এ সময় যাঁরা ইসলাম গ্রহণ করেন, হজরত আবু কুহাফা (রা.) তাঁদের অন্যতম। তাঁর ইসলাম গ্রহণে মহানবী (স.) যারপরনাই খুশি হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন হজরত আবু বকর (রা.)-এর পিতা।মহানবী (স.)-এর এই সাধারণ ক্ষমা পরবর্তী সময়ে ইসলামের ঝাণ্ডা উড়ানোর যুগান্তকারী মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এতদিন যারা ছিল তাঁর রক্তপিয়াসী, তারাই হলো এখন দেহরক্ষী। এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে চিরদিনের জন্য মিথ্যার ওপর সত্যের জয় হয়। আলোর জয় অন্ধকারের ওপর। এই রক্তপাতহীন বিজয়টি মূলত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে উদারতার এবং নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে মানবতার।আল্লাহ তাআলার ঘোষণা হচ্ছে, ‘যে ব্যক্তি ধৈর্য ধারণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে দেয়, সে যেন জেনে রাখে, অবশ্যই এটা হচ্ছে সাহসিকতার কাজসমূহের মধ্যে অন্যতম।’ (সূরা আশ শুরা: ৪৩)
প্রকাশিত : মঙ্গলবার , ৬ আগস্ট ২০২৪ , সকাল ০৯:০১।।
প্রিন্ট এর তারিখঃ সোমবার , ২ মার্চ ২০২৬ , সকাল ১০:৫৭
নবীজির মক্কাবিজয়ের পরবর্তী মুহূর্ত যেমন ছিল
ধর্ম ডেস্ক:মক্কা বিজয় একটি অসাধারণ ঘটনা। নীরব রক্তপাতহীন এক জয়ের নাম মক্কা বিজয়। এটি এমন ঘটনা, যার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তাঁর দীন ও রাসুলকে শক্তিশালী করেছেন। তাঁর ঘর ও শহরকে কাফের-মুশরিকদের হাত থেকে মুক্ত করেছেন। এই বিজয়ে আসমানের অধিবাসীগণ খুশী হয়েছিল এবং দলে দলে লোক ইসলামে প্রবেশ করল।নবী (স.) ১০ হাজার মুজাহিদের একটি বাহিনী নিয়ে মক্কার উদ্দেশ্যে বের হন। মুজাহিদ বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে বিনা বাধায় মক্কায় জয় করলেন। অষ্টম হিজরির রমজান মাসে ৬৩০ খ্রিস্টাব্দের ১১ বা ১৩ জানুয়ারি মক্কা বিজয় হয়। এই বিজয় সূচিত হয়েছিল কোনো রক্তপাত ছাড়াই। প্রথমে তিনি কাবা ঘরের দিকে গেলেন। তাঁর চারপাশে আনসার ও মুহাজিরগণ ঘিরে ছিল। কাবায় গিয়ে তিনি আল্লাহর ঘরের তাওয়াফ করলেন। নবীজির (স.) হাতে একটি ধনুক ছিল। সেসময় কাবার ভেতরে৩৬০টি মূর্তি ছিল। ধনুকের মাধ্যমে এক এক করে তিনি মূর্তিগুলোকে ভেঙে ফেললেন। এ সময় তিনি কোরআনের এই আয়াতটি পাঠ করছিলেন- ‘বলুন, সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে। নিশ্চয়ই মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল।’ (সুরা বনি ইসরাঈল: ৮)অতঃপর মহানবী (স.) কাবার ভেতরে প্রবেশ করলেন এবং নামাজ পড়লেন। সেদিন মক্কার অধিবাসীরা ভয়ে একেবারে মুহ্যমান হয়ে পড়েছিল। ইসলামের মূলোৎপাটনে যারা নেতৃত্বভার গ্রহণ করেছিল, অশ্লীল ভাষায় মহানবী (স.)-কে অজস্র গালাগাল করত, বিষাক্ত বর্শা হাতে তাঁকে হত্যা করতে ওঁত পেতে থাকত, তাঁর দেহ মোবারক থেকে রক্ত ঝরাত, নামাজে নাড়িভুঁড়ি চাপা দিত, মাতৃভূমি ত্যাগ করতে যারা বাধ্য করেছিল, আজ তারা সবাই কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় দলে দলে কাবা প্রাঙ্গণে সমবেত হলো। আজ তাদের সেই দর্প, গর্ব ও আস্ফালন নেই। ১০ হাজার মুসলিম বাহিনী দ্বারা বেষ্টিত আজ তারা শিয়ালের মতো লেজ গুটিয়ে দুরুদুরু বুকে চেয়ে আছে দয়ার সাগর মহানবী (স.)-এর ফয়সালার দিকে।নামাজশেষে কাবার ভেতর থেকে বাইরে আসলেন নবীজি। কুরাইশরা তখন সারিবদ্ধভাবে বাইরে দাঁড়িয়ে অবস্থান করছিল। তিনি তাদেরকে সম্বোধন করে বললেন- হে কুরাইশ সম্প্রদায়! তোমাদের সঙ্গে আজ আমি কেমন আচরণ করব বলে মনে করো? সকলেই উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করতে লাগল- আমরা আপনার কাছ থেকে খুব ভাল আচরণ কামনা করছি। তিনি বললেন, ‘তোমাদের প্রতি আজ কোনো অভিযোগ নেই। যাও! তোমরা সবাই মুক্ত।’ শুধু তা-ই নয়, কাফের নেতা আবু সুফিয়ানের ঘরে যে ব্যক্তি আশ্রয় নেবে, তাকেও তিনি ক্ষমা করেন। তিনি ঘোষণা করেন, ‘যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের বাড়িতে আশ্রয় নেবে, সে নিরাপদ থাকবে।’ (আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৪০৫, ৪০১)নবীজির (স.) এই অপূর্ব করুণা দেখে ভীতসন্ত্রস্ত মক্কাবাসী অভিভূত হয়ে পড়ে। সজল নয়নে নির্বাক তাকিয়ে থাকে মহামানবের মুখের দিকে। এমনও কি হতে পারে? জীবনভর যাঁর সঙ্গে শত্রুতা করেছি, চিরতরে শেষ করার জন্য সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছি, তিনিই আজ এই বদান্যতা, করুণা ও কোমলতা দেখালেন? তারা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে নবীজি (স.)-এর চরণতলে নিজেদের সঁপে দেয়। তারা উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করতে থাকে—‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।’ এ সময় যাঁরা ইসলাম গ্রহণ করেন, হজরত আবু কুহাফা (রা.) তাঁদের অন্যতম। তাঁর ইসলাম গ্রহণে মহানবী (স.) যারপরনাই খুশি হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন হজরত আবু বকর (রা.)-এর পিতা।মহানবী (স.)-এর এই সাধারণ ক্ষমা পরবর্তী সময়ে ইসলামের ঝাণ্ডা উড়ানোর যুগান্তকারী মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এতদিন যারা ছিল তাঁর রক্তপিয়াসী, তারাই হলো এখন দেহরক্ষী। এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে চিরদিনের জন্য মিথ্যার ওপর সত্যের জয় হয়। আলোর জয় অন্ধকারের ওপর। এই রক্তপাতহীন বিজয়টি মূলত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে উদারতার এবং নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে মানবতার।আল্লাহ তাআলার ঘোষণা হচ্ছে, ‘যে ব্যক্তি ধৈর্য ধারণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে দেয়, সে যেন জেনে রাখে, অবশ্যই এটা হচ্ছে সাহসিকতার কাজসমূহের মধ্যে অন্যতম।’ (সূরা আশ শুরা: ৪৩)